ডলারের প্রভাব কমাতে ইউয়ানে ঋণদান বাড়াচ্ছে চীন

আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের প্রভাব খর্ব করতে বিদেশে ইউয়ান বা রেনমিনবিতে ঋণদান বাড়াচ্ছে চীন। বিগত পাঁচ বছরে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংক অন্যান্য দেশে নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ, আমানত ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চারগুণে তুলেছে। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন (৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি) ইউয়ানে (৪৮ হাজার কোটি ডলার)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক মুদ্রাপ্রবাহে ডলারের প্রভাব কমাতে চীন এখন আগের চেয়ে আরো বেশি আগ্রাসী নীতির প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। খবর এফটি।

চীনে এখন বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ইউয়ানে মূল্যায়িত বন্ড কেনার সুযোগও বাড়ছে। তবে প্রধানত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মুদ্রাটির ব্যবহার বাড়ানোয় সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে দেশটি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ‘ডলারকে অস্ত্র হিসেবে’ ব্যবহারের নীতির জবাব দিতে এমন নীতি গ্রহণ করেছে চীন। বিশেষ করে রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে চীনা ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘোষিত সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।

অ্যাবসোলিউট স্ট্র্যাটেজি রিসার্চের উদীয়মান বাজারবিষয়ক অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম উলফ বলেন, ‘চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে ইউয়ানে লেনদেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি প্রমাণ করে যে যাই ঘটুক না কেন দেশটি তার বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারবে।’

চীনের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফর ফরেন এক্সচেঞ্জের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে চীনা ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক আয়নির্দিষ্ট সম্পদ (ফিক্সড ইনকাম অ্যাসেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় ট্রিলিয়ন (দেড় লাখ কোটি) ডলারের সমপরিমাণে। এর মধ্যে ইউয়ানে মূল্যায়িত সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে পৌঁছেছে ৪৮৪ বিলিয়ন (৪৮ হাজার ৪০০ কোটি) ডলারে। ৩৬০ বিলিয়ন (৩৬ হাজার কোটি) ডলারের ইউয়ানে মূল্যায়িত ঋণ ও আমানতও এর মধ্যে রয়েছে, যা ২০২০ সালে ছিল মাত্র ১১০ বিলিয়ন (১১ হাজার কোটি) ডলার।

ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টের (বিআইএস) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত চার বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ইউয়ানে মূল্যায়িত বিদেশী ব্যাংক ঋণ ৩৭৩ বিলিয়ন (৩৭ হাজার ৩০০ কোটি) ডলার বেড়েছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘এক্ষেত্রে ২০২২ সাল ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। চীনের মধ্যে সে সময় ডলার ও ইউরোর পরিবর্তে ইউয়ানে ঋণ বিতরণের প্রবণতা দেখা যায়।’

চীনে সুদহার তুলনামূলক কম হওয়ায় কেনিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলো ডলারে নেয়া পুরোনো ঋণকে ইউয়ানে রূপান্তর করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও স্লোভেনিয়া ইউয়ান বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এবং গত মাসে কাজাখস্তান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ মুনাফায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ইউয়ানের অফশোর বন্ড বিক্রি করেছে।

বেইজিংয়ের ইউয়ানে ঋণদান বৃদ্ধি পরিকল্পনার বড় অংশ যাচ্ছে বাণিজ্য অর্থায়নে। আন্তঃদেশীয় পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সুইফটের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে বৈশ্বিক বাণিজ্য অর্থায়নে ইউয়ানের হিস্যা চারগুণ বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এ হিস্যা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে। এর মধ্য দিয়ে বাণিজ্য অর্থায়নে ডলারের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত মুদ্রা হয়ে উঠেছে চীনা রেনমিনবি।

এছাড়া অফশোর ক্লিয়ারিং ব্যাংকের নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে মুদ্রা-বিনিময়ের (সোয়াপ) মাধ্যমেও ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়াচ্ছে চীন। পাশাপাশি নিজস্ব আন্তদেশী পেমেন্ট সিস্টেম সিপস (Cips) ব্যবহারের ওপরেও জোর দিচ্ছে চীন। গত বছরই এ পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে প্রতি প্রান্তিকে লেনদেনের গড় পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়।

তবে সুইফটভিত্তিক বৈশ্বিক লেনদেনে ইউয়ানের হিস্যা কিছুটা কমেছে। বিষয়টিকে চীনের অর্থপ্রবাহ সিপসে স্থানান্তরের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বার্ট হফম্যান। এ অর্থপ্রবাহ স্থানান্তর চীনের বহুমুদ্রাভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার লক্ষ্যকে এগিয়ে নিচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘চীনা কর্মকর্তাদের চোখে ডলারনির্ভর ব্যবস্থা অস্থিতিশীল এবং বহুমুদ্রা ব্যবস্থায় এ ধরনের কোনো অসুবিধা থাকবে না।’

চীনা শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত দশকে রেনমিনবিতে সংঘটিত বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রতি মাসে গড়ে ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে। বর্তমানে দেশটির মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং আন্তসীমান্ত লেনদেনের অর্ধেকেরও বেশি নিষ্পন্ন হচ্ছে ইউয়ানে।

তবে মূলধন নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউয়ানের ব্যবহার এখনো সীমিত। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে বৈশ্বিক সরকারি রিজার্ভে ইউয়ানের অংশ ছিল মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ। এর একটি বড় কারণ হলো সহজলভ্য ইউয়ানভিত্তিক সম্পদের অভাব।

এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে বেইজিং ও হংকং যৌথভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। হংকং কর্তৃপক্ষ শহরটিকে স্থির-আয় ও মুদ্রা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছে। পাশাপাশি, বেইজিং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আন্তঃব্যাংক ‘রিপো’ বাজার উন্মুক্ত করেছে, যাতে তারা ইউয়ানে মূল্যায়িত সম্পদ জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ঋণ নিতে পারে।

হংকংভিত্তিক আইনি সংস্থা সিমন্স অ্যান্ড সিমন্সের কর্মকর্তা ক্যারেন ল্যাম বলেন, ‘এ উদ্যোগ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কিছু বাস্তব সমস্যারও সমাধান করছে। বিনিয়োগকারীরা তখনই এ ধরনের সম্পদে বড় বিনিয়োগ করবেন, যখন এগুলো শুধু আয় নয়, অন্য কাজেও ব্যবহার করা যাবে।’

হংকংয়ের কর্তৃপক্ষ গত মাসেই ইউয়ানের তারল্য ও এতে মূল্যায়িত সম্পদের ইস্যু জোরদারে একটি ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা পল স্মিথ বলেন, “এটি হংকংয়ের স্টক কানেক্ট প্রোগ্রামের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত এর মধ্য দিয়ে আরো শক্তিশালী ফান্ডিং মুদ্রা হয়ে উঠবে ইউয়ান।’

চলতি বছরের গ্রীষ্মে ‘বন্ড কানেক্ট’ কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয় বেইজিং। এর মাধ্যমে চীনের মূল ভূখণ্ডের বিনিয়োগকারীকে হংকংয়ের ফিক্সট অ্যাসেট মার্কেটে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের লক্ষ্য বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ইউয়ানকে ডলারের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো নয়। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ইউয়ানের ভূমিকা বাড়িয়ে চীন দুই দিক থেকেই লাভবান হতে পারে।

আরও